যেভাবে আন্দোলনের প্রাণ ফেরায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
ঢাকা — ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লেখা হলে তাতে এক অসামান্য অধ্যায় হয়ে থাকবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন ১৬ ও ১৭ জুলাইয়ের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি করে দেওয়ায় অনেকটা নিভু নিভু অবস্থায়, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে ফিনিক্স পাখির মতো দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাতে হাত রেখে রাজপথে তারা গড়ে তোলেন এক অভেদ্য প্রাচীর, যা স্বৈরাচার পতনের পথকে আরও প্রশস্ত করেছিল।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও আন্দোলনের সংকটকাল ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নারকীয় হামলা এবং পুলিশের নির্যাতনের পর আন্দোলন দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে ১৭ জুলাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় এবং শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে তুলে নেওয়ায় আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দেয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, আন্দোলন হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ফিনিক্স পাখির মতো প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের উত্থান ঠিক তখনই সব বাধা ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, আইইউবি, এআইইউবি, ইউআইইউ, ড্যাফোডিল, মানারাত ও স্ট্যামফোর্ডসহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী।
১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা এবং প্রগতি সরণিতে শক্ত অবস্থান নেন তারা। একপর্যায়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে গুলি চালানো শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর পেয়ে ইস্ট ওয়েস্টসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাল হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের শক্ত প্রতিরোধের মুখে একসময় পুলিশ ও র্যাব পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের উদ্ধার করা হয়।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে অভিনব যোগাযোগ কৌশল আন্দোলন দমাতে ১৮ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে এর মোকাবিলা করেন। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটকে তারা নিজেদের জন্য শাপেবর হিসেবে কাজে লাগান। কারণ, সরকার তাদের পরবর্তী মুভমেন্ট বা পরিকল্পনা জানতে পারছিল না।
শিক্ষার্থীরা ডিসকর্ড (Discord), এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং বিশেষ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এই রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ও আইইউবি'র শিক্ষার্থীরা একই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকেন, যা তৎকালীন গোয়েন্দারা টেরই পাননি। এভাবেই ‘সেন্ট্রাল প্রাইভেট অ্যালায়েন্স’ গঠন করে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয় করে আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করেন।
চিকিৎসা ও আত্মত্যাগ গুলিবিদ্ধ ও আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য ইস্ট ওয়েস্ট এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মেডিকেল সেন্টারগুলো খুলে দেয়। শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা ছিল এমন সামনের সারির কেউ যদি নিহত হয়, পেছনের জন সামনে এসে সেই জায়গা পূরণ করবে, তবুও আন্দোলন থামবে না।
এই লড়াইয়ে অন্তত ৩০ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাদেরই একজন ছিলেন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাকিল পারভেজ। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৮ বার রক্তদান করা এই তরুণ ১৮ জুলাই উত্তরায় পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। তার বাবা আক্ষেপ ও গর্বের সাথে জানান, "১৮ তারিখ তার রক্ত দেওয়ার কথা ছিল। সেদিন সে দেশের জন্য নিজের দেহের সমস্ত রক্ত দিয়ে গেছে।" এছাড়াও রামপুরায় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন, যা শিক্ষার্থীদের স্বৈরাচার পতনের দিকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।
উপসংহার জুলাই বিপ্লবের আগে বা পরে কোনো কিছু পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কষেননি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যখন আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন তারা কেবল বুক পেতে গুলি নিয়ে প্রমাণ করেছেন দেশ বাঁচানোর লড়াই শুধু কারো একক দায়িত্ব নয়। গণঅভ্যুত্থানের পাতায় তাদের এই রক্তস্নাত আত্মত্যাগ চিরকাল এক অনন্য ইতিহাস হয়ে জ্বলজ্বল করবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাইয়ের ইতিহাস
আয়নাঘরের নির্মম টর্চার, সিগারেটের ছ্যাকা আর দ্বিতীয় জীবন পাওয়া ইফতেখারের গল্প
জুলাইয়ের ইতিহাস
. ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টা: জেল ভাঙা আর লুটপাটের আতঙ্কের মাঝেই যেভাবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল শিক্ষার্থীরা
জুলাইয়ের ইতিহাস