36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

আয়নাঘরের নির্মম টর্চার, সিগারেটের ছ্যাকা আর দ্বিতীয় জীবন পাওয়া ইফতেখারের গল্প

by Ataullah Rahman Polas · · 11 views
আয়নাঘরের নির্মম টর্চার, সিগারেটের ছ্যাকা আর দ্বিতীয় জীবন পাওয়া ইফতেখারের গল্প

ঢাকা — "তোর নাম আজ থেকে মিস্টার গুম ইফতেখার! এখান থেকে তোর বেঁচে ফেরার কোনো উপায় নেই।"—কানে আজও যেন এই কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর আইন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ইফতেখার আলমের।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং সরকার পতনের ঠিক আগমুহূর্তে (৫ আগস্ট ভোরের দিকে) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার হাতে আটক হন ইফতেখার। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তৎকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে আতঙ্কজনক প্রতীক—গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এ। দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টার সেই বন্দিজীবন আর অকথ্য নির্যাতনের এক রোমহর্ষক বিবরণ উঠে এসেছে তার মুখ থেকে।


আয়নাঘরের প্রবেশদ্বার ও প্রথম ডোজ ৫ আগস্ট ভোরের দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ইফতেখারকে তুলে নেওয়া হয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে যখন আয়নাঘরে প্রবেশ করানো হয়, শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

ইফতেখার জানান, বন্দিশালায় নেওয়ার পর তাকে ধাক্কা দিয়ে উল্টো করে শোয়ানো হয় এবং লোহার রড দিয়ে পায়ের নিচে ও শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ইচ্ছামতো পেটাতে থাকে নির্যাতনকারীরা। একটানা মারধরের পর তাকে বসিয়ে বলা হয়, "এটি কেবল একটি স্যাম্পল ডোজ! এখানে হাজারের ওপরে মানুষ আছে, যারা যুগের পর যুগ ধরে কেবল বেঁচে আছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গুমের নিউজ করিয়ে কী লাভ হবে? তোর আগে হাজার মানুষকে গুম করেছি, কেউ কিছু করতে পেরেছে?"


সিগারেটের ছ্যাকা আর টর্চারের ভয়াবহতা জিজ্ঞাসাবাদের নামে ইফতেখারের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক কায়দায় শারীরিক নির্যাতন। হ্যান্ডকাফ পরানো অবস্থায় তাকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। দাঁড়াতে না পারলে নখের দুই পাশে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়।

একপর্যায়ে একজন এসে তাকে নতুন এক ‘খেলা’ শেখানোর কথা বলে নখে সিগারেটের ছ্যাকা দেওয়া শুরু করে। ইফতেখার জানান, সিগারেটের আগুনের সামান্য নড়াচড়াও যদি মুখে গিয়ে লাগে, তবে তা সোজা মুখে ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। এরপরও যখন তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকর্গ জানান, তখন জুনিয়র কর্মকর্তাদের ডেকে গরম পানি এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।


চোখ বাঁধা চেয়ারে ২৪ ঘণ্টা এবং মুক্তির মুহূর্ত পুরো বন্দী অবস্থায় ইফতেখারকে একটি নির্দিষ্ট চেয়ারে চোখ বাঁধা অবস্থায় ২৪ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। সামান্য নড়াচড়া করলেই সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করা তত্ত্বাবধায়করা এসে থাপ্পড় মারতেন কিংবা দেওয়ালের সাথে ধাক্কা দিতেন।

অবশেষে ৫ আগস্ট বিকালের দিকে যখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং বাইরে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়, তখন বন্দিশালার ভেতরেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে না ছেড়ে ইফতেখারের চোখ ও মাথা ফাঁসির আসামির মতো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে পরদিন ভোরে (৬ আগস্ট) একটি গাড়িতে তোলা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাকে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয় যে, বাইরে গিয়ে যেন সে থানায় বা অন্য কোথাও এই বন্দিজীবনের কথা না বলে। পরবর্তীতে তাকে পূর্বাচল এলাকায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায় তারা।


বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনন্য ভূমিকা আয়নাঘরের ত্রাস ও পুলিশি ক্র্যাকডাউন উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাজপথে নেমেছিলেন, তা ছিল অবিস্মরণীয়। বিইউপি, ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এককাতারে শামিল হয়েছিলেন। কেবল শিক্ষার্থীই নয়, তাদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরাও।


উপসংহার আয়নাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বেঁচে ফেরা ইফতেখার আলমের এই গল্পটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর চালানো নির্যাতনের বিবরণ নয়, এটি জুলাই বিপ্লবের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের বর্বরতার এক জ্যান্ত দলিল। সমস্ত ভয়, গুম ও নির্যাতনের আশঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেদিন তারুণ্যের যে জোয়ার রাজপথে নেমেছিল, তার ফলেই আজ এই স্বাধীন ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে পেয়েছে এ দেশের মানুষ।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts