চোখ-হাত বেঁধে ঝুলিয়ে বেধড়ক পেটানো: ডিবি হেফাজতে ৭২ ঘণ্টার বিভীষিকা শোনালেন আবু বাকের মজুমদার
ঢাকা — ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আন্দোলনের সমন্বয়কদের ওপর নির্মম পৈশাচিকতা চালিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। রিমান্ডের নামে ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) কার্যালয়ে তখন চলত মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে ডিবি হেফাজতে নিজের ওপর হওয়া সেই অমানুষিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।
ডিবি হেফাজতে সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ানোর জেরে কীভাবে তাকে যমটুপি পরিয়ে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছিল, তার বিস্তারিত উঠে এসেছে এই বর্ণনায়।
হারুনের ভাতের হোটেল ও ‘তুই শিবির’ অপবাদ আবু বাকের মজুমদার জানান, ডিবি হেফাজতে তাদের দ্বিতীয় দিন তাকে, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদকে হারুনের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। হারুন তখন তার সেই কুখ্যাত ‘ভাতের হোটেলে’ বসে খাচ্ছিলেন। হারুনের আচরণ ছিল অত্যন্ত রূঢ়। ছাত্রলীগের উপ-সম্পাদক ক্যাটাগরির মতো আচরণ করে হারুন দম্ভভরে বলেন, "আমি নেতা ছোট করি, নেতা বানাই না। দেখিস নি নুরুকে (ভিপি নুর) কী করে ছেড়ে দিয়েছি! নুরু এখন রিমান্ডে কান্নাকাটি করে।"
একপর্যায়ে হারুন আবু বাকেরকে উদ্দেশ করে বলেন, "তুই শিবির।" বাকের দৃঢ়ভাবে এই অপবাদ অস্বীকার করেন। হারুন বারবার তাকে শিবির প্রমাণের চেষ্টা করলে আবু বাকের উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে বলেন, "আমার পুরো বাড়ির মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আমার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল, আমি সেই বৃহত্তর পরিবারের সন্তান।"
এই কড়া জবাবে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে যান হারুন। হাতের ভাতের প্লেট ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক অফিসারকে ইশারা দেন বাকেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
যমটুপি, হাতকড়া এবং মৃত্যুর আতঙ্ক এরপর নাহিদ ও আসিফের কাছ থেকে বাকেরকে আলাদা করে ফেলা হয়। তিন থেকে চার মিনিট পর দুজন লোক এসে তাকে দরজায় ডাকে, যাদের হাতে ছিল ‘যমটুপি’ (কালো হুড) ও হাতকড়া। বাকের বুঝতে পারেন, হারুনের সাথে ব্যক্তিত্ব দেখানোর কারণে খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে।
চোখে যমটুপি ও হাতে কড়া পরানোর পর তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। চারদিক অন্ধকার। তাকে বারবার ডানে-বামে ঘুরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাকেরের মনে তখন মৃত্যুভয়—"ছাদের পাশে নিয়ে এই অবস্থায় ফেলে দেয় কি না! ফ্যাসিস্ট সরকারের কাছে তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সাধারণ ঘটনা ছিল।"
টানা ৭২ ঘণ্টা ঘুমহীন শরীরে ঝুলিয়ে নির্যাতন একটি রুমে নিয়ে দেয়ালের সাথে ঘুরিয়ে যমটুপি খুলে গামছা দিয়ে শক্ত করে চোখ বাঁধা হয় বাকেরের। টানা ৭২ ঘণ্টা না ঘুমানোর কারণে তার শরীরে কোনো ব্যালেন্স ছিল না। তাকে একপায়ে দাঁড়াতে বললে তিনি বারবার ব্যর্থ হয়ে পড়ে যান। এরপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
সরকারি চাকরি, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবির কর্মকর্তারা ক্ষিপ্ত হয়ে জানতে চান—সরকার কোটা নিয়ে সব দাবি মেনে নেওয়ার পরও কিসের আন্দোলন? বাকের চুপ থাকেন। তখন একজন বলে ওঠে, "ওরে ঝোলা!"
পাশের রুমে নিয়ে আবু বাকেরের দুই হাত ওপরে ঝুলিয়ে বাঁধা হয়। বাকের তাদের বলেন, "পিঠে মারলে মরে যাব, আর বাম পায়ে সমস্যা আছে, ওটা ভেঙে যাবে।" কিন্তু কে শোনে কার কথা! একপর্যায়ে নিতম্বে মোটা ও শক্ত লাঠি দিয়ে একের পর এক সজোরে আঘাত করা শুরু হয়। আঘাতের চোটে বাকের চিৎকার করে উঠলে নির্যাতনকারীরা বলতে থাকে, "প্রাইম মিনিস্টারকে ধন্যবাদ দিয়ে বিবৃতি দিবি।" বাকের আর্তনাদ করেও দৃঢ়তার সাথে বলেন—"না!"
এক চিপি পানি এবং মানসিক প্রস্তুতি নির্যাতনের এক পর্যায়ে পিপাসায় ছটফট করতে থাকা বাকের পানি চাইলে তাকে বোতলের মুখ (চিপি) দিয়ে মাত্র এক চিপি পানি দেওয়া হয়, যা তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা ভেজানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। বেধড়ক মারধরের পর তাকে একটু রেস্ট দেওয়া হয়। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বাকের তখন দ্বিতীয় দফায় মার খাওয়ার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন।
আবু বাকের মজুমদারের এই রোমহর্ষক বর্ণনা প্রমাণ করে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং আজকের এই নতুন বাংলাদেশ কোনো আপসের মাধ্যমে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্ত, ঘাম আর ডিবি কার্যালয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সহ্য করা অমানুষিক নির্যাতনের ইতিহাস।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাইয়ের ইতিহাস
আয়নাঘরের নির্মম টর্চার, সিগারেটের ছ্যাকা আর দ্বিতীয় জীবন পাওয়া ইফতেখারের গল্প
জুলাইয়ের ইতিহাস
. ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টা: জেল ভাঙা আর লুটপাটের আতঙ্কের মাঝেই যেভাবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল শিক্ষার্থীরা
জুলাইয়ের ইতিহাস