পানি লাগবে কারও, পানি?’: ১৮ জুলাইয়ের রক্তাক্ত রাজপথে মানবিকতার অমর প্রতীক শহীদ মুগ্ধ
ঢাকা — “পানি লাগবে কারও, পানি?”—একটি সাধারণ বাক্য, কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এটি আর সাধারণ কোনো বাক্য নেই। এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয়, মানবিক ও হৃদয়বিদারক এক প্রতীক। ১৮ জুলাই, কোটা সংস্কার আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলাকালে উত্তরায় যখন চারদিকে গুলির শব্দ, ধোঁয়া আর চরম আতঙ্ক, তখন এক বোতল পানি আর বিস্কুট হাতে আন্দোলনকারীদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছিলেন এক অকুতোভয় তরুণ। তার নাম মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ।
কে ছিলেন এই মুগ্ধ? ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামনাইল গ্রামের সন্তান মুগ্ধ ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে জমজ। বাবা ছিলেন হেলথ ইন্সপেক্টর এবং মা গৃহিণী। অত্যন্ত মেধাবী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মুগ্ধ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিউপি)-এ এমবিএ করছিলেন। পাশাপাশি তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ফ্রিল্যান্সিং করতেন, বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য ছিলেন, ফুটবল খেলতেন এবং ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন।
সেই ভয়াল মুহূর্ত ও মুগ্ধের আত্মত্যাগ ১৮ জুলাই উত্তরা আজমপুর এলাকায় আন্দোলনকে ঘিরে পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। হাজারো শিক্ষার্থী ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। এমন সময় নিজের কাঁধে একটি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসেন মুগ্ধ, যে ব্যাগে ছিল পানির বোতল আর বিস্কুট। তৃষ্ণার্ত সহযোদ্ধাদের পানি পান করানোর মাত্র ১৫-২০ মিনিট পরই একটি ঘাতক বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মুগ্ধের কপালে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। নিভে যায় এক তরুণের তাজা প্রাণ, কিন্তু জন্ম নেয় এক অমর ইতিহাস।
১৮ জুলাইয়ের রক্তাক্ত চিত্র ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ মুগ্ধের এই আত্মত্যাগের দিনটি অর্থাৎ ১৮ জুলাই ছিল আন্দোলনের অন্যতম রক্তাক্ত ও ভয়ংকর দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল পুরো দেশ। ঢাকা ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় সংঘর্ষ, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় সেদিন অন্তত ২৭ জন নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষ আহত হন।
সেদিন সরকার আলোচনার আহ্বান জানালেও তা প্রত্যাখ্যান করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাত ৯টা থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) করে দেয় তৎকালীন সরকার। অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয় মেট্রোরেল চলাচল এবং দেশজুড়ে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
মুগ্ধ দিবস: এক চিরন্তন প্রেরণা আজও জুলাই বিপ্লবের কথা উঠলেই সবার আগে কানে ভেসে আসে সেই অমর ডাক—"পানি লাগবে কারও, পানি?" মুগ্ধ হয়তো জানতেন না, তার এই শেষ ডাক একদিন পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাবে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, কখনো কখনো অস্ত্র নয়, মানবিকতাও হতে পারে প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। নিজের কথা না ভেবে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা তরুণ প্রজন্মের কাছে চিরকাল এক অনন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাই ১৮ জুলাই দিনটিকে অনেকেই এখন ভালোবেসে এবং পরম শ্রদ্ধায় ‘মুগ্ধ দিবস’ হিসেবে স্মরণ করেন।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাইয়ের ইতিহাস
আয়নাঘরের নির্মম টর্চার, সিগারেটের ছ্যাকা আর দ্বিতীয় জীবন পাওয়া ইফতেখারের গল্প
জুলাইয়ের ইতিহাস
. ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টা: জেল ভাঙা আর লুটপাটের আতঙ্কের মাঝেই যেভাবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল শিক্ষার্থীরা
জুলাইয়ের ইতিহাস