36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত হটস্পট রামপুরা-বনশ্রী: ভিডিও বিশ্লেষণে উঠে এলো বিজিবির নির্বিচার গুলি ও হত্যাযজ্ঞের চিত্র

by Ataullah Rahman Polas · · 23 views
জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত হটস্পট রামপুরা-বনশ্রী: ভিডিও বিশ্লেষণে উঠে এলো বিজিবির নির্বিচার গুলি ও হত্যাযজ্ঞের চিত্র

ঢাকা — শান্ত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ঢাকার রামপুরা, মেরুল বাড্ডা ও বনশ্রী। মিছিল-মিটিং বা রাজনৈতিক কর্মসূচি এখানে সচরাচর কম হলেও ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এই এলাকাগুলোই পরিণত হয়েছিল এক রক্তস্নাত 'হটস্পট'-এ। মারণাস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল এ এলাকার ছাত্র-জনতা। আর সেখানেই রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বিশেষ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের হাতে ঘটেছিল নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। প্রযুক্তি ও ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখন সেই বিভীষিকাময় দিনের অনেক অজানা তথ্য সামনে আসছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আন্দোলন হয়তো স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু ১৮ জুলাই সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় রাস্তায় নামেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেদিন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করলে ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ এবং আইইউবিসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। এই প্রতিরোধে রামপুরাবাসীও অংশ নেয়। ওই দিন রামপুরায় ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর রহমান পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পর আন্দোলন এক নতুন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

১৯ জুলাইয়ের বিভীষিকা এবং ছাদ থেকে ঝুলন্ত ব্যক্তিকে গুলি সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনগুলোর একটি ছিল ১৯ জুলাই। কমপ্লিট শাটডাউনের ওই দিনে রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় অন্তত ২৩ জন নিহত হন। সেদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির কাছে বনশ্রী এইচ ব্লকের একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা এক ব্যক্তিকে পুলিশ অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিবিদ্ধ ওই ব্যক্তির নাম আমির হোসেন, যিনি পেশায় একজন হোটেল কর্মচারী এবং সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেছেন। ওই ঘটনায় জড়িত পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তও শেষ হয়েছে।

বিজিবির সামরিক গ্রেডের অস্ত্র ব্যবহার ও ভিডিও বিশ্লেষণ দ্য ডেইলি স্টার এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের যৌথ অনুসন্ধানে ১৯ জুলাইয়ের দুই শতাধিক ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে বিজিবির নির্বিচার গুলি চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। ওইদিন রামপুরায় মোতায়েন করা হয়েছিল বিজিবির ৫ ও ২৬ নম্বর ব্যাটালিয়ন। ২৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম।

ভিডিও ফুটেজ এবং ডিজিটাল প্যাটার্ন (ক্যামোফ্লাজ প্যাচ) বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, বনশ্রী জি ব্লকে ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট ও লাল হেলমেট পরা যে অফিসারটি সাবমেশিনগান (টাইপ ৫৬) থেকে সরাসরি জনতার দিকে গুলি ছুড়ছিলেন, তিনি ছিলেন স্বয়ং লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান। তার ওই গুলির পরপরই ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র আশিকুল ইসলাম ও ২৪ বছর বয়সী তরুণ রমজান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এছাড়া জুমার নামাজের পর মেরাদিয়া বাজারে নাদিম নামের এক ব্যক্তি বিজিবির গুলিতে নিহত হন এবং কামরুল নামের আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে তার পা হারান।

ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই গুলি এবং জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বেসামরিক জনসমাবেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো একটি নথিতে দাবি করা হয়েছিল, ১৯ জুলাই রামপুরায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে বিজিবি ৯৭২ রাউন্ড গুলি চালিয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রামপুরায় গুলি চালানোর সময় কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন না। একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিত করেছেন যে, ঘটনার ৮-১০ দিন পর (২৬-২৮ জুলাই) বিজিবি কর্মকর্তারা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ওই নথিতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় করে নেন।

বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবস্থান ও দায়মুক্তি ১৯ জুলাই যখন রামপুরায় বিজিবির নির্বিচার গুলি চলছিল, তখন সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। ৫ আগস্টের পর এক ব্রিফিংয়ে মহাপরিচালক স্বীকার করেন যে, একজন অফিসার (লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান) ফায়ার করেছিলেন এবং তাকে ওই পদ থেকে অপসারণ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে লে. কর্নেল রেদোয়ানের ক্ষেত্রে কেবল ‘সামারি কোর্ট মার্শাল’-এর মাধ্যমে চাকরির জ্যেষ্ঠতা ৬ মাস পেছানো ছাড়া বড় কোনো শাস্তির খবর পাওয়া যায়নি।

উপসংহার এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জুলাই অভ্যুত্থানের রামপুরা ও বনশ্রী ট্র্যাজেডির নিহতদের পরিবার এখনো বিচারের অপেক্ষায়। ডেলটা হাসপাতালের সামনে পড়ে থাকা রিকশাচালক ইসমাইল হোসাইন কিংবা ১৪ বছরের মাদ্রাসাছাত্র আশিকুলের পরিবার আজও জানে না, কবে তারা এই বিচার পাবে। নিহতদের স্বজনদের সেই কান্নাই প্রমাণ করে, এই শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts