36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ উপেক্ষা করে যেভাবে জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী

by Ataullah Rahman Polas · · 18 views
জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ উপেক্ষা করে যেভাবে জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী

ঢাকা — দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করাই সেনাবাহিনীর মূল কাজ। কিন্তু চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সেই সেনাবাহিনীকেই দেশের মানুষের বুকে গুলি চালানোর জন্য রাজপথে নামিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত উপরি মহলের নির্দেশ যাই থাকুক না কেন, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের বুকে গুলি না চালিয়ে সত্যের পক্ষে এবং ছাত্র-জনতার পক্ষেই অবস্থান নেয়।


দিশেহারা সরকারের কারফিউ ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন রাজপথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীদের গুলিতে লাশের মিছিল দীর্ঘ হতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯ জুলাই সন্ধ্যার পর ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন তিনি। তার ঠিক আগে সেখানে ডেকে আনা হয় তিন বাহিনীর প্রধানসহ পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও আনসারের প্রধানদের।

শেষ অস্ত্র হিসেবে জারি করা হয় দেশব্যাপী কারফিউ। তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেদিন গণমাধ্যমের সামনে 'রাস্তায় কাউকে দেখামাত্র গুলি করার' (শুট অ্যাট সাইট) নির্দেশের কথা জানান। উপস্থিত রাজনৈতিক নেতাদের চোখেমুখে তখন ছিল আতঙ্কের ছাপ। ১৪ দলের নেতা আমির হোসেন আমু তখন বলে ওঠেন, "এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক না।" পরক্ষণেই ওবায়দুল কাদের বলেন, "এটি সরকারি সিদ্ধান্ত। সরকার বা ক্যাবিনেট থেকে প্রজ্ঞাপন যাচ্ছে। কাজেই এটা অবশ্যই কারফিউ এবং এখানে শুট অ্যাট সাইটও আছে।"


সেনাবাহিনীর ধৈর্য ও সংযম শেখ হাসিনা হয়তো ভেবেছিলেন, সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে নিজের দেশের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করবে এবং লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে পারবেন। ১৯ জুলাইয়ের পর দেশজুড়ে রাস্তায় নামতে থাকে সেনাবাহিনী। কিন্তু জনতার তীব্র ক্ষোভের মুখে তারা নৃশংস না হয়ে অত্যন্ত ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে।

অন্যদিকে, পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ অস্ত্র হাতে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা যখন সাধারণ মানুষের আন্দোলন দমনে মেতে ওঠে, তখন সেই অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে চারদিকে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। তবুও সেনাবাহিনী মাঠে থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে যায়।


২ আগস্ট: মিরপুর ১০ নম্বরে মোড় ঘোরানো দৃশ্যপট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে প্রথম দিকে সেনাবাহিনী সরকারি নির্দেশনা পালন করলেও, ২ আগস্ট প্রথমবারের মতো ছাত্র-জনতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে দেখা যায় তাদের। সেদিন মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে সশস্ত্র আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয় সেনাবাহিনী। এমনকি আওয়ামী লীগ ক্যাডার ও পুলিশকে ওই এলাকা থেকে সরাতে বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোড়ে তারা।

সেদিন ছাত্র-জনতা সেনাবাহিনীকে সামনে রেখেই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর নিজেদের দখলে রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, ২ আগস্টের সেই ঘটনাই স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে শেখ হাসিনার আমলের শেষ পরিণতি ঠিক কোন দিকে এগোচ্ছে।


উপসংহার যে আশায় শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়েছিলেন, তা আর পূরণ হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন সেনাবাহিনী ঢাল হয়ে তাকে আগলে রাখবে। কিন্তু চূড়ান্ত পরিণতিতে সেনাবাহিনী যখন স্বৈরাচারের নির্দেশ উপেক্ষা করে নিশ্চিতভাবে ছাত্র-জনতার পক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়, তখনই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সব আশা শেষ হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা এবং পতন ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসনের।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts