36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

আন্দোলন দমাতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াল ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’, ক্ষতি লাখো কোটি টাকা

by Ataullah Rahman Polas · · 19 views
আন্দোলন দমাতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াল ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’, ক্ষতি লাখো কোটি টাকা

ঢাকা — ১৮ জুলাই, ২০২৪। বাইরে থেকে ভেসে আসছে গুলির বিকট আওয়াজ। উৎকণ্ঠা নিয়ে কী ঘটেছে জানতে সাধারণ মানুষ যখনই মোবাইল ফোন হাতে নিলেন, দেখলেন স্ক্রিন কেবল ঘুরছে। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ—সবই নিস্তব্ধ। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো নিজের ওয়াইফাই বা রাউটারে সমস্যা। কিন্তু না, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দেশ যেন এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যায়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দমাতে এভাবেই এক ছটকায় পুরো দেশের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে কোটি মানুষকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল তৎকালীন সরকার।


পর্দার আড়ালের কৌশল ও কণ্ঠরোধের চেষ্টা তৎকালীন শেখ হাসিনা ও তার সরকার মূলত আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধ করতেই এই নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের ধারণা ছিল, সোশ্যাল মিডিয়া থাকলেই মানুষ কথা বলবে, প্রতিবাদ করবে এবং লাইভে এসে সরকারের সমালোচনা করবে। তাই সবকিছু বন্ধ করে দিলেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে।

নেটব্লকস (NetBlocks), ইন্টারনেট সোসাইটি পালস এবং ওএনআই-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ব্ল্যাকআউটে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক উধাও হয়ে যায়। সরকারের নির্দেশে সব মোবাইল অপারেটর ও বড় ব্রডব্যান্ড সার্ভিস একযোগে তাদের ডেটা সংযোগ বন্ধ করে দেয়। অথচ তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী নির্লজ্জভাবে দাবি করেছিলেন, "আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করিনি, ইন্টারনেট নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেছে।"


অন্ধকারে হত্যা ও দমন-পীড়ন ইন্টারনেট শাটডাউনের এই সুযোগে দেশজুড়ে পুলিশ ও র‍্যাব দিয়ে কঠোর হাতে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়। দিনে প্রকাশ্য লাঠিচার্জ আর রাতের আঁধারে চলে নির্বিচার ধরপাকড় ও হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু ইন্টারনেট না থাকায় কেউ সেসবের ভিডিও প্রকাশ বা লাইভ করতে পারেনি।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও প্রায় স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারেনি কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কেবল সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি মিডিয়া সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একপাক্ষিক সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছিল।


অর্থনৈতিক ধস ও জনজীবনের স্থবিরতা ইন্টারনেট না থাকায় শুধু যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়নি; স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাত এবং বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর (রেমিট্যান্স) মতো জরুরি কাজগুলোও। ভেঙে পড়েছিল মানবিক সহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসাব ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ওই কয়েকটি দিনে দেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।


আন্তর্জাতিক মহলের ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিদেশি মিডিয়া, মানবাধিকার সংগঠন এবং দূতাবাসগুলোকেও এক প্রকার ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা হয়েছিল। তবে ইন্টারনেট শাটডাউনকে ‘কণ্ঠরোধের নতুন অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র সমালোচনা করে বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান এবং আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে মৌলিক অধিকার ও তথ্যপ্রবাহের চরম ও ভয়ংকর লঙ্ঘন বলে স্পষ্ট বিবৃতি দেয়। পুরো বিশ্ব যখন এই ঘটনায় সোচ্চার, তখনও টিভির পর্দায় তৎকালীন মন্ত্রীদের হাবভাব ছিল এমন, যেন দেশে কিছুই হয়নি।


উপসংহার চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং নাটকীয় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষকে বোবা বানিয়ে দেওয়ার যে লোমহর্ষক চেষ্টা সেদিন করা হয়েছিল, তা দেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts