36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

৩৬ দিনের রক্তস্নাত প্রতিরোধ: ঢাল-তলোয়ারহীন সাধারণ মানুষের যে বীরত্বে রচিত হলো ‘বাংলাদেশ ২.০’

by Ataullah Rahman Polas · · 25 views
৩৬ দিনের রক্তস্নাত প্রতিরোধ: ঢাল-তলোয়ারহীন সাধারণ মানুষের যে বীরত্বে রচিত হলো ‘বাংলাদেশ ২.০’

ঢাকা — মানুষ, মানুষ আর মানুষ। এত মানুষের এক কাতারে একাত্ম হওয়া, এমন অবিশ্বাস্য জনস্রোত কবে দেখেছে বিশ্ব? ৩৬ দিনের টানা স্লোগান, আন্দোলন, প্রতিরোধ আর রাজপথে লেগে থাকা তাজা রক্তের দাগে অবশেষে যবনিকা ঘটেছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার। রচিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ২.০’।

আন্দোলনের ব্যাপকতা ও জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয় বাংলাদেশ—সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিবও দেশ ছেড়ে বা পদ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই অসাধ্য সাধন? এর নেপথ্যের কারিগর কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল ছিল না, ছিলেন একদম সাধারণ কিছু মানুষ, যারা দেশের প্রয়োজনে হয়ে উঠেছিলেন একেকজন ‘অসাধারণ’ বীর।


বিবেকের তাড়নায় রাজপথে শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলনের শুরুতে যখন শিক্ষার্থীদের ওপর চরম নির্যাতন ও গুলির বন্যা বয়ে যাচ্ছিল, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি শিক্ষকরা। বিবেকের তাড়নায়, জীবনের হুমকি উপেক্ষা করেই তারা নেমে এসেছিলেন রাজপথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তখন বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, "এখন চুপ থাকা অপরাধ।"

একজন শিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, "যে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কবি বা কেরানি প্রকাশ্য পথে এই হত্যার বিচার চায় না, আমি তাকে ঘৃণা করি।" সন্তানের মতো শিক্ষার্থীদের রক্ত যখন রাজপথে বইছিল, তখন মৃত্যুকে পরোয়া না করে অভিভাবক ও শিক্ষকরা তাদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।


টিনের ঢাল আর ‘সুপারওম্যান’ নুসরাতের প্রতিরোধ গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের সামনে শিক্ষার্থীদের না ছিল কোনো অস্ত্র, না ছিল আধুনিক বর্ম। তাদের সম্বল ছিল কেবল বুকভরা সাহস আর দেশপেম। রাজপথে পড়ে থাকা সামান্য টিনের টুকরোকে ঢাল বানিয়ে তারা রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন পুলিশের আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে।

পুলিশের গাড়ি থামিয়ে একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো তরুণী নুসরাত যেন হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়ের ‘সুপারওম্যান’। নুসরাতের এই সাহসিকতা দেখে পুরো বাংলাদেশ যেন নতুন করে প্রতিরোধের ভাষা ও শক্তি খুঁজে পেয়েছিল।


রিকশাচালক সুজনের আইকনিক স্যালুট ফুসঁ ওঠা ছাত্র-জনতাকে রোখার সাধ্য কার? অসীম সাহসী সেই সাধারণ মানুষদেরই একজন প্রতিনিধি ছিলেন রিকশাচালক সুজন। শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তার সেই আইকনিক ‘স্যালুট’ আজও মানুষের চোখে ভাসে। তিনি সেদিন স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার যেন এই বাংলার জমিনে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তাই ছাত্র-জনতার পাশে আছি।"


৫ আগস্ট: রাজনৈতিক পরিচয়হীন এক জনসমুদ্র ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে দাবি আর অঙ্গীকার ছিল একটাই—সরকার পতন। কারফিউ, ব্যারিকেড, আর গুলির ভয় তুচ্ছ করে সেদিন রাজপথে নেমেছিল এক অবিশ্বাস্য ঐক্য। সেই মিছিলে কোনো দলের ব্যানার ছিল না, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। পরিচয় ছিল একটাই—তারা সবাই বাংলাদেশি।

যে মায়েরা এতদিন সন্তানদের ঘরে আটকে রাখতে চাইতেন, সেই মায়েরাই সেদিন সন্তানের হাত ধরে মিছিলে নেমেছিলেন। বাবা, শহীদ পরিবারের স্বজন, চাকরিজীবী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, গৃহিণী—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন।


উপসংহার ৩৬ দিনের এই গণঅভ্যুত্থানের মূল নায়ক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, বরং রিকশাচালক, ছাত্র, শিক্ষক আর গৃহিণীদের মতো সেইসব সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে অসাধারণ এক ইতিহাস রচনা করেছেন। তাদের রক্ত আর ঘামেই আজ আমরা স্বপ্ন দেখছি এক নতুন বাংলাদেশের।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts