36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

২৫ জুলাই:মানুষের জীবনের চেয়ে কি পিলারের দাম বেশি? মেট্রোরেলে হাসিনার ‘মায়াকান্না’ এবং ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ

by Ataullah Rahman Polas · · 42 views
২৫ জুলাই:মানুষের জীবনের চেয়ে কি পিলারের দাম বেশি? মেট্রোরেলে হাসিনার ‘মায়াকান্না’ এবং ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ

ঢাকা — বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২৫ জুলাই একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত দিন। একদিকে হাসপাতালে আহতদের আর্তনাদ আর মর্গে লাশের দীর্ঘ সারি, অন্যদিকে মেট্রো স্টেশনের ক্ষয়ক্ষতি দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখের পানি ফেলা। মানুষের জীবনের চেয়ে স্থাপনার প্রতি এই ‘মেকি কান্না’ সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

মেট্রোরেল স্টেশনে শেখ হাসিনার 'কান্না' ও তীব্র সমালোচনা জুলাইয়ের ২৫ তারিখে যখন পুরো দেশ শোকে স্তব্ধ, তখন কারফিউ শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে না গিয়ে ছুটে যান মিরপুর ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশন পরিদর্শনে। স্টেশনের কাচ ও পিলারের ভাঙা অংশ দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং চোখের পানি ফেলেন। তিনি বলেন, "এটা বিশ্বাস হতে চায় না যে এদেশের মানুষ এটা করতে পারে।" অথচ দেশব্যাপী শতাধিক ছাত্র-জনতার প্রাণহানি, মর্গে লাশের সারি বা আহতদের চিকিৎসা নিয়ে তখন তার কোনো ভ্রুক্ষেপ বা বক্তব্য ছিল না।

শিক্ষার্থীদের রক্তের দাগ না শুকাতেই মেট্রো স্টেশন নিয়ে শেখ হাসিনার এই কান্নাকে ছাত্র-জনতা ‘অভিনয়’ আখ্যা দেয়। এই ঘটনার পরপরই সীমিত ইন্টারনেটেই তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) মধ্যে তীব্র ট্রোল এবং ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকে, "নাটক কম করো প্রিয়।" ছাত্রনেতাদের মতে, শহীদদের প্রতি এই অবজ্ঞা ও উপহাসই আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছিল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপ ও অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন সেদিন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি প্রতিবেদনে জানায় যে, আন্দোলন দমনে পুলিশ প্রাণঘাতী (লেথাল) অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্দোলনকারীদের ওপর অভিযান ও বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানায়। সমন্বয়করা জানান, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে সেসময়কার বীভৎস ফুটেজগুলো সরবরাহ করেছিলেন, যার ফলে এই আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছিল।

র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের অদ্ভুত বয়ান আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলির ফুটেজ প্রকাশ পেলেও ২৫ জুলাই র‌্যাব দাবি করে যে, তারা কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করেনি; কেবল টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে। অন্যদিকে ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদ দাবি করেন, পুলিশ ও ছাত্রলীগ মারার জন্য নাকি গোপনে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল!

সমন্বয়কদের অভিনব আত্মগোপন কৌশল তখন চারজন সমন্বয়ক ডিবি কার্যালয়ে বন্দি ছিলেন এবং বাকিদের হন্যে হয়ে খুঁজছিল গোয়েন্দারা। এমন পরিস্থিতিতেও বাকি সমন্বয়করা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা অভিনব কৌশল ব্যবহার করতেন। ফজরের সময় ডিউটি পরিবর্তনের সুযোগে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন। অনেক সময় বোরকা পরে, এমনকি সাংবাদিকদের গাড়িতে চড়েও তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাতায়াত করতেন।

তৎকালীন সরকারের ধারণা ছিল, কারফিউ জারি করে এবং শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে তুলে নিলেই আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু 'জেন-জি'-এর কয়েক স্তরের নেতৃত্ব (লেয়ারড লিডারশিপ) এবং অভিনব কৌশল বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল তারা। ২৫ জুলাইয়ের এই ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, দমন-পীড়ন ও মেকি আবেগ দিয়ে একটি ন্যায্য আন্দোলনকে থামানো যায় না।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts