শহীদ মিনারের জনসমুদ্র থেকে স্বৈরাচার পতনের এক দফার ঐতিহাসিক ঘোষণা
ঢাকা — বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ও চূড়ান্ত দিনগুলোর একটি ছিল ৩ আগস্ট ২০২৪, যাকে আন্দোলনকারীরা প্রতীকীভাবে ‘৩৪ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই দিনেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিশাল জনসমুদ্র থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ দাবি। এই ঘোষণার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মাথাতেই ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।
শহীদ মিনারে জনসমুদ্র ও মৃত্যুভয় জয় টানা হত্যা, নির্যাতন, আর রক্তপাতের প্রতিবাদে ৩ আগস্ট দুপুর থেকেই ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে আসতে শুরু করেন। বৃষ্টি, কারফিউ বা বুলেটের ভয়—কোনো কিছুই সেদিন এই ছাত্র-জনতাকে আটকাতে পারেনি। কারো হাতে ছিল লাল-সবুজ পতাকা, কারো হাতে প্ল্যাকার্ড, আবার কেউ এসেছিলেন সন্তান বা ভাই হারানোর শোক বুকে নিয়ে। দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল, ঢাকা মেডিকেল এবং শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিক্ষুব্ধ মহাসাগরে।
ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ ঘোষণা বিকেলে এই জনসমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ দাবি। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন, "বাংলাদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।" এই এক দফা শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগ এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ।
সমন্বয়করা জানান, তারা চাইলে লুকিয়ে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই ঘোষণা দিতে পারতেন। কিন্তু তারা চেয়েছিলেন সরাসরি জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিতে, যাতে সাধারণ মানুষ সাহস পায়।
সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এক দফার পাশাপাশি ৪ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। সমাবেশে আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—কর ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করা, সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, কলকারখানা (গার্মেন্টসসহ) ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানো, বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ রাখা এবং প্রশাসন ও পুলিশকে সরকারের কোনো নির্দেশ না মানার আহ্বান।
সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও সরকারের প্রতিক্রিয়া একদিকে যখন রাজপথে এক দফার আওয়াজ, অন্যদিকে সেদিন সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সাথে বৈঠকে শেখ হাসিনা আলোচনার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, "গণভবনের দরজা খোলা, আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে বসতে চাই।" কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; ছাত্র-জনতা ঘৃণাভরে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, "আন্দোলনটি আর শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।"
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহ সেদিন শুধু শহীদ মিনার নয়, রামপুরা, বাড্ডা, সায়েন্স ল্যাব, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও সমাবেশে অংশ নেন। সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর, জামালপুর ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয় এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, সেদিন সেনা সদর দপ্তরে কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি জনগণের জীবন, সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উপসংহার যে শহীদ মিনার জাতিকে মাথা নত না করতে শেখায়, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে ৩ আগস্ট রচিত হয়েছিল নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা। এই দিনের এক দফা ঘোষণা এবং জনতার উত্তাল স্রোত স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, স্বৈরাচারের পতন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আর এর মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল রক্তিম জুলাই শেষ হওয়ার চূড়ান্ত কাউন্টডাউন।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
‘আংশিক বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে’: ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান