‘আংশিক বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে’: ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ
ঢাকা — ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালান শেখ হাসিনা। এরপরই জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। কিন্তু যে ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তে স্বৈরাচারের পতন হলো, সেই আলোচনা প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
সেদিন বিকালেই সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ২৪-এর লাইভে যুক্ত হয়ে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও অন্য নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—হাসিনার পতন কেবল প্রাথমিক বিজয়, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন শেষ হয়নি।
‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ছাড়া চূড়ান্ত বিজয় নয়’ লাইভে যুক্ত হয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, "আমাদের এক দফা দাবি ছিল স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, তার পতন ঘটেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী যে রাষ্ট্রকাঠামো, তারা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের মাধ্যমেই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে।"
সেনাপ্রধানের বৈঠক ও সমন্বয়কদের ক্ষোভ সেনাপ্রধানের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক এবং সেখানে ছাত্র-প্রতিনিধিদের না ডাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সমন্বয়করা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তারা জানান, এই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছে ছাত্র-নাগরিকদের আহ্বানে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গঠিত হতে হবে তাদের নেতৃত্ব ও আহ্বানে। কোনো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ছাত্র-জনতা মেনে নেবে না।
কারওয়ান বাজারে রাত ৮টায় রূপরেখা ঘোষণার ডাক সমন্বয়করা ঘোষণা দেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তারা নিজেরাই জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন। এ বিষয়ে লাইভে থাকা আরেক সমন্বয়ক বলেন, "আমরা আজ রাত ৮টায় কারওয়ান বাজার মোড়ে সার্ক ফোয়ারায় একটি সংবাদ সম্মেলন করে সেই রূপরেখাটা ঘোষণা করব। সেই রূপরেখায় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সুশীল সমাজ, আমাদের শিক্ষক এবং এই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন—তাদের সমন্বয়ে একটি সরকারের রূপরেখা আমরা দেব এবং সেটিকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।"
তারা আরও স্পষ্ট করে দেন যে, এই জাতীয় সরকারে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার দোসর বা সমর্থকরা থাকতে পারবে না।
‘রাজপথ ছাড়বে না ছাত্র-জনতা’ বিজয়ের উল্লাসে ভেসে গিয়ে আন্দোলন শেষ না করারও আহ্বান জানান সমন্বয়করা। তারা জানান, এক দফার ঘোষণা যেদিন দেওয়া হয়েছিল, সেদিন থেকেই তারা জানতেন বিজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু আংশিক এই বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ বিজয়ে রূপ দিতে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ দেন তারা।
সমন্বয়কদের দাবি ছিল, "ছাত্র-জনতাই এই অভ্যুত্থানের মূল স্টেকহোল্ডার, তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ওই সরকারে ঘটতে হবে। যতদিন তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান থাকবে।"
উপসংহার ৫ আগস্ট বিকেলের এই সাক্ষাৎকারটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সামরিক বাহিনী বা সনাতন রাজনৈতিক দলগুলোর ছকে না হেঁটে, দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণরা যে নিজেরাই রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে—সমন্বয়কদের এই অকুতোভয় ঘোষণাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল। এই ঘোষণার ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
‘৩৬ জুলাই’ বা ৫ আগস্ট: ছাত্র-জনতার দ্রোহের আগুনে যেদিন ছাই হলো ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান