‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’: যে স্লোগানে কেঁপে উঠেছিল স্বৈরাচারের মসনদ
ঢাকা — ২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার পেছনে সবচেয়ে মোড় ঘোরানো দিনটি ছিল ১৪ জুলাই। এদিন সকাল থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ গণপদযাত্রা এবং রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি হয়তো একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু বিকেলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এক রাতেই বদলে যায় ইতিহাসের গতি, আর জন্ম নেয় স্বৈরাচার পতনের এক অদম্য জনস্রোত।
পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে বঙ্গভবনে পদযাত্রা ১৪ জুলাই ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের চতুর্দশতম দিন। এদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে বঙ্গভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। শাহবাগ, মৎস্য ভবন এবং শিক্ষা অধিকার চত্বর হয়ে তারা যখন এগোচ্ছিলেন, তখন পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সেই ব্যারিকেড ভেঙে সচিবালয় সংলগ্ন সড়কে ঢুকে পড়েন।
পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ, মামলা প্রত্যাহার এবং কোটা সংস্কারের এক দফা বাস্তবায়নে সংসদের জরুরি অধিবেশন ডাকার জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এদিন ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতেও জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সেই বিতর্কিত মন্তব্য ও স্ফুলিঙ্গ সারাদিন শিক্ষার্থীদের এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পর বিকেলে চীন সফর শেষে সংবাদ সম্মেলন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে অবজ্ঞা করে তিনি বলেন, "মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতিপুতিরা কেউ মেধাবী না? যত রাজাকারের বাচ্চারা, নাতিপুতিরা হলো মেধাবী, তাই না?"
প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যঙ্গাত্মক কথা এবং কথা বলার সময় তার শরীরী ভাষায় প্রকাশ পাওয়া ক্ষোভ ও উপহাস সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিবেকবোধে তীব্র আঘাত হানে। যে ‘রাজাকার’ শব্দটিকে ব্যবহার করতে অতীতে হাজারবার ভাবতে হতো বা ট্যাগ খাওয়ার ভয় থাকত, সেই শব্দটিকে ঘিরেই ফুঁসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্যুৎহীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শুরু হয় চাপা গুঞ্জন। অন্ধকার ভেদ করে বিজয় একাত্তর হলের পদ্মা ভবন থেকে প্রথম গর্জে ওঠে স্লোগান: “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!” এর সাথে সাথে জবাব আসে, “কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!”
ছাত্রলীগ এতদিন শিক্ষার্থীদের যে স্লোগান দিতে বাধ্য করেছিল, তার বিপরীতে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই নতুন ও তীব্র ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ বেছে নেন। মুহূর্তেই এই স্লোগান ঢাবির প্রতিটি হলে এবং পরবর্তীতে পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির অঘোষিত স্লোগান হিসেবে।
হলের তালা ভেঙে নারীদের জাগরণ রাতের এই প্রকম্পন শুধু ছাত্রদের হলেও সীমাবদ্ধ ছিল না। রোকেয়া হলসহ মেয়েদের হলগুলোতেও পৌঁছে যায় সেই প্রতিবাদের ধ্বনি। থালা-বাটি বাজিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেন তারা। যে ছাত্রীরা আগে কখনো আন্দোলনে নামেননি, তারাও সেদিন হলের গেটের তালা ভেঙে রাস্তায় নেমে আসেন। নারী শিক্ষার্থীদের এই অপ্রতিরোধ্য সাহস ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
উপসংহার ১৪ জুলাইয়ের এই রাত প্রমাণ করেছিল যে, ক্ষমতার দম্ভ এবং তাচ্ছিল্য কীভাবে একটি শাসকগোষ্ঠীর পতন ডেকে আনতে পারে। ছাত্রনেতাদের মতে, ১৪ জুলাইয়ের ওই বক্তব্য দিয়েই শেখ হাসিনা মূলত নিজের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। ওই রাতের পর থেকে আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা পরিণত হয়েছিল আপামর ছাত্র-জনতার এক মুক্তির সংগ্রামে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন