পুলিশ ও ছাত্রলীগের শটগানের মুখে যখন ঢাল হলো সেনাবাহিনী: মিরপুর ১০-এ সেদিন যা ঘটেছিল
ঢাকা — ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোতে রাজপথের দৃশ্যপট কতটা ভয়ংকর ছিল এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী কীভাবে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ ৪ আগস্টের মিরপুরের চিত্র। সেদিন মিরপুর ১০ নম্বর ও কাজীপাড়া এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অহিংস কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে শটগান নিয়ে হামলা চালায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। তবে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে সেদিন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ফাঁকা গুলি ছুড়ে সশস্ত্র হামলাকারীদের হটিয়ে দিয়ে ছাত্র-জনতাকে রক্ষা করেন সেনা সদস্যরা।
কাজীপাড়ার অহিংস আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা মোহনা টিভির সেদিনের একটি সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ৪ আগস্ট শিক্ষার্থীরা কাজীপাড়া এলাকায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অহিংসভাবে তাদের আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছিলেন। এমন সময় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের দিক থেকে একদল দুষ্কৃতিকারী প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মিছিলে হামলা চালাতে এগিয়ে আসে।
আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, হামলাকারীরা ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মী। তাদের হাতে ছিল শটগান এবং তারা প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দিকে এগোচ্ছিল।
শিক্ষার্থীদের রক্ষায় সেনাবাহিনীর ফাঁকা ফায়ার সশস্ত্র ক্যাডারদের এমন প্রাণঘাতী হামলার মুখে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা যখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন, ঠিক তখনই তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিক্ষার্থীদের জানমালের হেফাজত এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যরা মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এ সময় সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের ছত্রভঙ্গ করতে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে সেনাবাহিনী মুহুর্মুহু ফাঁকা গুলি (ফাঁকা ফায়ার) ছোড়ে। সেনাবাহিনীর এই ত্বরিত পদক্ষেপে পিছু হটতে বাধ্য হয় সশস্ত্র ক্যাডাররা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য সেদিনের সেই ভয়াল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর এমন ইতিবাচক ও রক্ষনশীল ভূমিকায় স্বস্তি প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। মোহনা টিভির ক্যামেরার সামনে ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত এক শিক্ষার্থী একটি শটগানের কার্তুজ হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলেন, "শটগান দিয়া আমাদের উপরে মারছে... ছাত্রলীগের হাতে শটগান!"
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ নাগরিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, "আওয়ামী লীগের কর্মী এমনকি পুলিশসহ ছাত্রদের বিনা কারণে হামলা করতেছিল। সেনাবাহিনী এসে আল্লাহর রহমতে ছাত্রদের উদ্ধার করছে।"
উপসংহার এর ঠিক একদিন আগে, ৩ আগস্ট সেনা সদরের ঐতিহাসিক বৈঠকে 'জনগণের ওপর আর কোনো গুলি নয়'—সেনাপ্রধানের এমন নির্দেশনার পরই ৪ আগস্ট মিরপুরের রাজপথে এই দৃশ্য দেখা যায়। সশস্ত্র দলীয় ক্যাডার ও পুলিশের হামলার বিপরীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অবস্থান সাধারণ ছাত্র-জনতার মনে প্রবল সাহস জুগিয়েছিল। সেনাবাহিনীর এই নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণেই পরদিন ৫ আগস্ট লাখো জনতার 'লং মার্চ টু ঢাকা' সফল হয় এবং পতন ঘটে দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসকের।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন