জুলাই-আগস্ট হত্যাযজ্ঞ: নিহতদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী-শ্রমজীবী, প্রমাণ লোপাটে গণকবর ও বেওয়ারিশ লাশ বানানোর অপচেষ্টা
ঢাকা — ২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে একদিকে যেমন রচিত হয়েছে সাধারণ মানুষের বীরত্বের ইতিহাস, অন্যদিকে উন্মোচিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও লাশ গুমের লোমহর্ষক চিত্র।এই আন্দোলনে অন্তত ৭২৪ জন নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী এবং শ্রমজীবী মানুষ। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, আন্দোলন দমাতে মরিয়া পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এই হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ ধ্বংস করতে অসংখ্য লাশ জোরপূর্বক বেওয়ারিশ হিসেবে মাটিচাপা দিয়েছেন।
ওসির ফোনে লাশ গুমের চেষ্টা এবং কবরস্থানের চিত্র
৪ আগস্ট দুপুর ২টায় রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানের মোহরার আমিনুল ইসলামের ফোনে কল করেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান। তিনি সরাসরি ১০টি লাশ দাফন করার কথা বলেন। মোহরার আমিনুল ইসলাম কাগজপত্র ছাড়া লাশ দাফনে অস্বীকৃতি জানালে ওসি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেন। শেষ পর্যন্ত আমিনুল ইসলামের দৃঢ়তায় জুরাইন কবরস্থানে সেই ১০টি লাশের দাফন সম্ভব হয়নি। তবে ওই ১০টি লাশ এরপর কোথায় দাফন করা হয়েছে বা আদৌ দাফন করা হয়েছে কি না, তার কোনো হদিস মেলেনি।
শুধু তাই নয়, রায়েরবাজার কবরস্থানে অজ্ঞাত হিসেবে অন্তত ৭৫টি লাশ দাফন করা হয়েছে, যার অনেকগুলোরই কোনো হিসাব নেই। জুরাইন কবরস্থানেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে অন্তত ৫টি অজ্ঞাত লাশ জোরপূর্বক দাফন করেছেন। একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দাফনের ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো তারিখ ও ঠিকানা বসিয়ে ব্যাপক ঘাপলা করা হয়েছে।
নিহতদের ডিএনএ স্যাম্পল বা পরিবারের খোঁজ নেওয়ার নিয়ম থাকলেও, পুলিশ রাতের আঁধারে তড়িঘড়ি করে এসব লাশ দাফন করে প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। বর্তমানেও বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে অন্তত ৩৫টি বেওয়ারিশ বা ‘ভবঘুরে’ তকমা দেওয়া লাশ পড়ে আছে, যেগুলো এই আন্দোলনের সময়কার বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহতের পরিসংখ্যানে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবীদের দীর্ঘ সারি
নিহত ৭২৪ জনের মধ্যে ৭১ শতাংশই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজধানীতে (৫১১ জন)। এর বাইরে চট্টগ্রামে ৬০ জন, খুলনায় ৫৬ জন, রাজশাহীতে ৪৫ জন, সিলেটে ২৩ জন, রংপুরে ১২ জন এবং ময়মনসিংহে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ৪ বছরের শিশু আহাদ এবং ৬ বছরের শিশু রিয়া গোপসহ অন্তত ৬৭ জন শিশুও রয়েছে। নিহতদের একটি বিশাল অংশ শিক্ষার্থী, দ্বীনমজুর, ব্যবসায়ী, দোকান শ্রমিক ও পথচারী।
তথ্য গায়েব ও প্রকৃত সংখ্যা জানার চ্যালেঞ্জ সমন্বয়ক এবং মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো, সেসময় ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে রেজিস্টার খাতা ও সিসিটিভি ফুটেজ পরিকল্পিতভাবে গায়েব করা হয়েছে। অনেকে পুলিশের ভয়ে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এছাড়া ময়নাতদন্তের ঝামেলা বা পুলিশের হয়রানির ভয়ে অনেক পরিবার হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে গেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর তালিকায় ৮১৯ জনের নাম থাকলেও সেখানে অনেকেই 'অজ্ঞাত' হিসেবে রয়ে গেছেন। আশুলিয়া ও যাত্রাবাড়ীতে ভ্যানে লাশের স্তূপ এবং গণকবরের মতো বীভৎস ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
সমন্বয়কদের দাবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব এলাকায় গণকবরের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। তারা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের কাছে অবিলম্বে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে নিখোঁজ ও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের দাবি জানিয়েছে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে দমনপীড়ন এবং কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির বিতর্ক
জুলাই ৩৬
‘মৃত ভেবে লাশের স্তূপে ফেলে যায় পুলিশ’: শরীরে ১৫০ ছররা গুলি নিয়ে মাসুমের বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক গল্প
জুলাই ৩৬