36July
জুলাই আন্দোলন

জিম্মি করে ‘কর্মসূচি প্রত্যাহার’: ২৮ জুলাই ডিবি কার্যালয়ে যা ঘটেছিল

by Ataullah Rahman Polas · · 23 views
জিম্মি করে ‘কর্মসূচি প্রত্যাহার’: ২৮ জুলাই ডিবি কার্যালয়ে যা ঘটেছিল

ঢাকা — ২৪-এর রক্তস্নাত ‘লাল জুলাই’-এর ঘটনাবহুল দিনগুলোর মধ্যে ২৮ জুলাই ছিল এক চরম নাটকীয় ও উৎকণ্ঠার দিন। একদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে ‘জোরপূর্বক’ কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ানো হয়, অন্যদিকে টানা ১১ দিন পর দেশে মোবাইল ফোর-জি (4G) ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়। এদিনই তৎকালীন সরকার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেছিল।


ডিবি হেফাজতে আরও এক সমন্বয়ক ও স্বজনদের উদ্বেগ ২৮ জুলাই ডিবি হেফাজতে থাকা পাঁচ সমন্বয়ককে ছেড়ে না দিয়ে উল্টো নতুন করে নুসরাত তাবাসসুম নামের আরেক সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়ে। এদিন ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা কোনো সমন্বয়কের সঙ্গেই তাদের বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে ফিরে যান তারা। শুধু স্বজনরাই নন, সমন্বয়কদের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকের একটি প্রতিনিধি দল ডিবি কার্যালয়ে গেলেও তাদের দেখা করতে না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, "নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের আনা হয়েছে, পরিবার যেন নিশ্চিন্ত থাকে।" তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই সুরে বলেছিলেন, "সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশ যখনই মনে করবে তারা ঝুঁকিমুক্ত, তখনই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।"


জোরপূর্বক ‘আন্দোলন প্রত্যাহার’-এর ভিডিও বার্তা ২৮ জুলাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ডিবি হেফাজত থেকে সমন্বয়কদের একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ। সেই ভিডিওতে দৃশ্যত বিপর্যস্ত অবস্থায় সমন্বয়কদের দেখা যায়, যেখানে তারা একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করে বলেন, "সার্বিক স্বার্থে আমরা এই মুহূর্ত থেকে আমাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করছি।"

তবে গোয়েন্দা পুলিশের জিম্মি অবস্থায় দেওয়া এই বিবৃতিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন রাজপথে থাকা অন্যান্য শিক্ষার্থী ও সহ-সমন্বয়করা। তারা অভিযোগ করেন, ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক এই ভিডিও বার্তা আদায় করা হয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ডিবি অফিস থেকে দেওয়া কোনো ঘোষণা তারা মানেন না এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন চলবে।


সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৪৭ দেশজুড়ে যখন লাশের মিছিল এবং নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আসছিল, তখন ২৮ জুলাই দুপুরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সারা দেশে ১৪৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে ৫০০ বা ১০০০-এর যে খবর ছড়াচ্ছে, সেগুলোকে তিনি 'বিভ্রান্তিকর' বলে দাবি করেন।


১১ দিন পর ফোর-জি চালু এবং ফেসবুক-টিকটককে তলব দেশজুড়ে টানা ১১ দিন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর ২৮ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে মোবাইলের ফোর-জি (4G) নেটওয়ার্ক চালু করা হয়। তবে ইন্টারনেট চালু হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সরকারের কড়া নজরদারি ও ক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ফেসবুক ও টিকটকের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, ফেসবুকে গুজব, মিথ্যা তথ্য ও উসকানি ছড়িয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটানো হয়েছে এবং এই মৃত্যুর দায় ফেসবুক এড়াতে পারে না। মিথ্যা প্রচারণা বন্ধে উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সশরীরে ঢাকায় বিটিআরসিতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ফেসবুক ও টিকটক কর্তৃপক্ষকে তলব করেন তিনি।


উপসংহার ২৮ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছিল যে, সরকার দমন-পীড়ন এবং শীর্ষ সমন্বয়কদের জিম্মি করে আন্দোলন থামানোর যে কৌশল নিয়েছিল, তা কার্যত বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিবি কার্যালয় থেকে আদায় করা সেই জোরপূর্বক বিবৃতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দমাতে তো পারেইনি, উল্টো তাদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল, যা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts