36July
জুলাই ৩৬

চলন্ত এপিসি থেকে ছুড়ে ফেলা সেই নিথর দেহ: বিজয়ের দিনে ইয়ামিনকে স্মরণ

by Ataullah Rahman Polas · · 23 views
চলন্ত এপিসি থেকে ছুড়ে ফেলা সেই নিথর দেহ: বিজয়ের দিনে ইয়ামিনকে স্মরণ

ঢাকা — ইতিহাসের সুদীর্ঘ পরিক্রমায় জুলাই মাস সাধারণত আসে বর্ষার স্নিগ্ধ পরশ আর সবুজের সজীবতা নিয়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলার ইতিহাসে বর্ষার স্নিগ্ধতা নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতার ঘন অন্ধকার এবং উষ্ণ রক্তে রঞ্জিত এক অনির্বাণ বিপ্লবের মহাকাব্য হয়ে ধরা দিয়েছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর দানবীয় গুলির আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন। সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের অন্যতম এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল সাভারে পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি) থেকে এক তরুণের নিথর দেহ টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা। পুলিশের সেই পাশবিকতার শিকার হওয়া তরুণের নাম ছিল শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন।


বিবেকের তাড়নায় রাজপথে নেমেছিলেন ইয়ামিন বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন ইয়ামিন। ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণার পর তিনি সাভারের ব্যাংক টাউনের বাসায় ফিরে আসেন। কিন্তু বন্ধুদের নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা এবং আহতদের আর্তনাদ তার অন্তরকে বিদীর্ণ করে তোলে। ১৮ জুলাই জোহরের নামাজের পর আহত বন্ধুদের খোঁজ নিতে আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। ছুটে যান উত্তাল রাজপথে। কিন্তু কে জানতো, তার এই পদচারণাই তাকে ঠেলে দেবে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের অন্তিম প্রান্তে!


এপিসির ওপর বীরত্ব এবং পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ ১৮ জুলাই সাভারের রাজপথ রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় রণক্ষেত্রে। আন্দোলন দমনে পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি) থেকে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছাত্র-জনতার ওপর মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ করা হচ্ছিল। রক্তে লাল হয়ে ওঠে রাজপথ। নিরীহ আহতদের আর্তচিৎকার শুনে মৃত্যুকে পরোয়া না করে অদম্য সাহসে এগিয়ে যান ইয়ামিন।

উদ্দেশ্য ছিল একটাই—সাঁজোয়া যানের ঢাকনাটি বন্ধ করে দেওয়া, যেন ভেতর থেকে আর গুলি ছুড়তে না পারে পুলিশ। একপর্যায়ে তিনি এপিসির ওপর উঠে পড়েন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দেয় সেই বীরত্বগাথা। একটি বুলেট বিদীর্ণ করে তার বুক। এপিসির ছাদেই লুটিয়ে পড়েন এই অকুতোভয় তরুণ।


হৃদয়বিদারক সেই ভিডিও এবং দাবানল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চলন্ত সাঁজোয়া যান থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে নির্মমভাবে পিচঢালা সড়কে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। যেন এক জীবন্ত স্বপ্নকে মাটিতে নিক্ষেপ করছে তারা! পরবর্তীতে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ইয়ামিনের এই করুণ পরিণতি ও পুলিশের বর্বরতার দৃশ্য কোটি বাঙালির হৃদয়ে তীব্র কম্পন তোলে। অনেকেই নিজের ভাই বা সন্তানকে কল্পনা করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আর এই শোকই রূপ নেয় ক্ষোভে, যা সারা দেশে প্রতিরোধের আগ্নেয়গিরি জাগিয়ে তোলে।


বিচারের দাবি এবং নতুন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (ভিডিওতে আমিনুল ইসলাম উল্লেখিত) জানান, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। শহীদ পরিবারগুলোর একমাত্র প্রত্যাশা সঠিক বিচার এবং ট্রাইব্যুনাল সেই প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের দাবি, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য কেবল ফ্যাসিবাদের চেহারা বদলানো ছিল না, বরং একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন এবং কাঠামোগত সংস্কার করা ছিল। ইয়ামিনসহ হাজারো শহীদের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে, যখন তাদের আত্মত্যাগের প্রতিদান হিসেবে সেই নতুন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত হবে।


উপসংহার বিজয়ের এই দিনগুলোতে বাংলাদেশ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন ইয়ামিনের মতো অগণিত শহীদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই স্বাধীনতা কত বড় ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত। এপিসি থেকে ফেলে দেওয়া ইয়ামিনের সেই রক্তাক্ত দেহ কেবল একটি ট্র্যাজেডি নয়, বরং স্বৈরাচার পতনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাগুলোর একটি হয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts