36July
জুলাই আন্দোলন

১৯ জুলাই: হেলিকপ্টার থেকে গুলি, রক্তক্ষয়ী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং ৯ দফার জন্ম

by Ataullah Rahman Polas · · 40 views
১৯ জুলাই: হেলিকপ্টার থেকে গুলি, রক্তক্ষয়ী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং ৯ দফার জন্ম

ঢাকা — বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় দিনগুলোর একটি ছিল ১৯ জুলাই। ছাত্র-জনতার ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর দ্বিতীয় দিন ছিল সেটি। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ (ব্ল্যাকআউট), হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি, কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনীর মাঠে নামার মতো অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল পুরো দেশ। সেদিন শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, সারা দেশে সাধারণ ছাত্র-জনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে রণক্ষেত্র তৈরি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ১৯ জুলাই সারা দেশে অন্তত ৫৫ থেকে ৬৭ জনের প্রাণহানি ঘটে।

রণক্ষেত্র রাজধানী ও হেলিকপ্টার থেকে গুলি শুক্রবার, ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর থেকে দলে দলে মাঠে নামতে শুরু করে ছাত্র-জনতা। রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা এবং যাত্রাবাড়ী পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। যাত্রাবাড়ীতে একটানা ৭২ ঘণ্টার ভয়াবহ সংঘর্ষ চলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের ভাষ্যমতে, জুমার নামাজ শেষে বের হওয়া মিছিলে ফ্লাইওভারের ওপর থেকে পুলিশ ও র‍্যাব নির্বিচারে গুলি চালায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য ছিল আকাশপথে আক্রমণ। সেদিন প্রথমবারের মতো আন্দোলনকারীদের দমাতে র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। মোহাম্মদপুরের আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে বছিলা ব্রিজ—সব জায়গাতেই হেলিকপ্টার থেকে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হেলিকপ্টার থেকে করা ‘হেডশট’-এ অনেককে লুটিয়ে পড়তে দেখা গেছে।

সরকারি স্থাপনায় আগুন ও ব্ল্যাকআউট আন্দোলনের এই চরম পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশন, বিআরটিএ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বন্ধ হয়ে যায় বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট। অন্যদিকে, তৃতীয় দিনের মতো পুরো দেশে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে এক ‘তথ্য ব্ল্যাকআউট’ তৈরি করে তখনকার সরকার। এর মধ্যেই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, এবং পল্টন এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মী।

৯ দফা দাবি ও মধ্যরাতে কারফিউ সরকারের তরফ থেকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার ক্ষমা প্রার্থনা, মন্ত্রীদের পদত্যাগ এবং হত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। বিশ্লেষকদের মতে, সবার সঙ্গে সমন্বয় করে দেওয়া এই ৯ দফার মধ্যেই মূলত লুকিয়ে ছিল সরকারের পতনের ‘এক দফা’র বীজ।

আন্দোলন নস্যাৎ করতে ১৯ জুলাই মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় রাত ১২টার পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয় এবং মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনী।

নতুন বাংলাদেশের দিকে যাত্রা কারফিউ বা গুলি, কোনো কিছুই সেদিন মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে দমাতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিলেন অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। ১৯ জুলাইয়ের এই শোক ও রক্তপাত পরবর্তীতে শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বৈরাচারের পতন।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts